Saturday, June 18, 2016

আরোবি

আমার স্মৃতি শক্তি মনে হয় নষ্ট হয়ে গিয়েছে । অতীতের অনেক কিছুই এখন আর মনে করতে পারি না । অবাক হওয়ার ক্ষমতাও নেই আগের মতো । কিছুতেই যেন আর অবাক লাগে না । সব কিছুই মনে হয় স্বাভাবিক । আজ রাতে সম্ভবত বৃষ্টি হবে । আকাশের কান্না দেখতে ভালোই লাগে আমার । সেই সাথে ভালো লাগে দুরের মেঘগুলোর চিৎকার । সন্ধ্যা থেকেই আমাদের বাসায় বিদ্যুৎ নেই । কি জানি একটা সমস্যা হয়েছে । আমার খুব একটা টেনশন নেই । বিদ্যুৎ না থাকারও আলাদা একটা অনন্দ আছে । মোমবাতির আলোতে একটা বই পড়ছিলাম । লেখা গুলো দিন দিন এতো ছোট হয়ে যাচ্ছে যে পরিষ্কার কিছু চোখে পড়ে না । চোখের উপর আলাদা একটা নির্যাতন করেই আমি পড়া চালিয়ে যাচ্ছি । বেশিক্ষণ চালিয়ে যাওয়া গেল না । আমি অসহায় হলেও আমার চোখ অসহায় না । সে প্রতিবাদ করতে যানে । মাথাব্যথার জন্য মোমবাতি নিভিয়ে আমি শুয়ে পড়লাম । মাথার মধ্যে অদ্ভুত সব চিন্তা ভাবনা ঘুরপাক খাচ্ছে । এতো সহজে ঘুম আসবে না আমার । তারপরেও চোখ বন্ধ করে শুয়ে আছি । ঘুম আসার ব্যর্থ চেষ্টা করে যাচ্ছি আমি । আয় ঘুম আয় ! আমার চোখে ঘুম আয় ।
.
একটা অপরিচিত কণ্ঠে আমার ঘুম ভাঙ্গল । দরজায় কড়া নাড়ছে বার বার । উঠতে মন চাচ্ছে না কেন জানি । দরজাটা রিমোট কন্ট্রোল হলে ভালো হতো । আমি উঠে দরজা খুলে দিলাম । দরজার যা অবস্থা । বেশি ঝাঁকা-ঝাঁকি করলে কখন ভেঙ্গে যাবে কে জানে ।
-ভিতরে আসতে পারি ?
-পারেন
মেয়েটা আমার রুম ঘুরে ঘুরে দেখছে । মনে হচ্ছে এতো অগোছালো রুম এই প্রথম দেখছে ।
-আমরা পাশের ফ্লাটে নতুন এসেছি । আপনার সাথে পরিচিত হতে এলাম ।
-ও আচ্ছা
-কি করেন আপনি ?
-কিছু না । শুধু ঘুরাঘুরি করি । 
-আমার নাম মিতু । 
-ও আচ্ছা
-আপনার নাম কি ?
-আমার নাম নাই ।
-ইয়ার্কি করেছেন কি ? ইয়ার্কি আমার একদম ভালো লাগে না ।
-আমার ভালো লাগে । আপনি কি চা খাবেন ?
-হুম খাওয়া যেতে পারে । 
-রান্না ঘরে চা পাতি আছে । দুধ নাই । দুধ ছাড়াই খেতে হবে । কালার চা ।
-অসুবিধা নেই । আমি লাল চা খেতে পারি ।
-তাহলে একটু করে নিয়ে আসেন । আমিও ফ্রেশ হয়ে আছে । ফ্রেশ মুখে চা খেতে ভালোই লাগে । অনেক দিন সকালে চা খাই না । আমারটাতে একটু চিনি বেশি দিয়েন ।
মেয়েটা অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে আমার দিকে । রেগে গিয়েছে কিনা কিছুই বুঝা যাচ্ছে না । মানুষের রাগ-হাসি , দুঃখ-কষ্ট এখন কেন জানি আমি আর বুজতে পারি না । অনুভূতিহীন হয়ে গিয়েছি মনে হয় ।
-আমি আসি তাহলে ।
-সে কি পরিচিতই তো হওয়া হলো না । চা খেয়ে যান ।
-লাগবে না । আমি আসি ।
-জ্বি ঠিক আছে ।
মেয়েটা চলে গেল । আমারও আর চা খাওয়া হলো না । আমি বের হলাম । দোকানে যেয়ে চা খাওয়া যাবে । চা আজ আমি খাবোই ।
চায়ের দোকান গুলোতে আজ-কাল খুব ভিড় হয় । মানুষের পেটে এখন ভাত না গেলেও চা ঠিকি যায় । আগে চা ছিল দুই রকমের । এখন চায়ের প্রকার ভেদ বেড়েছে । দুধ চা , লাল চা , ঝাল চা , লেয়ার চা ,লেবু চা , কমলা চা আরও কতো নামের চা বেড়িয়েছে এখন । দুই লেয়ার দিয়ে চা খেয়েছিলাম আকাশের সাথে একবার । উপরে লাল রং নিচে সাদা রং । ভালোই স্বাদ !
আমি দাড়িয়ে থেকে চা খাচ্ছি । বলেছিলাম চিনি বেশি দিতে । কিন্তু এতো বেশি দিয়ে ফেলেছে যে শরবত হয়ে গেছে । আজ সারাদিন কি কি করবো সেটার একটা প্লান করা যেতে পারে চা খেতে খেতে । আমার আর প্লান করা হলো না । ফোন বাজতেছে । আমি কল রিসিভ করলাম ।
-হ্যালো কে জুলেখা ?
-আমি জুলেখা না । আরোবি ।
-ও আরোবি তুমি । কেমন আছো ?
-ভালো আছি । তুমি কেমন আছো ?
-ভালো খারাপের মাঝামাঝি । 
-জুলেখা কে ?
-আমার বান্ধবী । প্রাইমারিতে এক সাথে পড়েছি । 
-ও তা এই সময় জুলেখা মনে হয় তোমাকে প্রতিদিন ফোন দেয় ?
-হুম । ফোন দিয়ে আমার খোজ খবর নেয় । ভাবছি জুলেখাকে একদিন তোমার কাছে নিয়ে যাবো ?
-লাগবে না 
-জানো ওনা অনেক সুন্দর করে ভাত রাঁধতে পারে । তরকারী ছাড়াই খাওয়া যায় । সেই ইয়ামি !
-হুম জানি ।
-তুমি কিভাবে জানো ?
-তুমিই তো বললে ।
-ও তাই তো । ঠিক আছে এখন রাখি । চা খাচ্ছি তো । পরে কথা বলবো আবার ।
-ঠিক আছে । বাই ।
-বাই ।
চায়ের সাথে পত্রিকা পড়তে ভালোই লাগে । আমি পত্রিকা বেশিক্ষণ পড়তে পারি না । মাথা ঘোরে । পাত্র চাই পাত্রী চাই এর বিজ্ঞাপন দেখতেছি আমি । বিজ্ঞাপনে কোন ছবি নাই ।
রূপসী , নামাজি , একমাত্র বাবার একমাত্র কন্যা , ডিভোর্সি , এক সন্তানের জননী , আমেরিকান সিটিজেনশীপ পাত্রীর জন্য সুশিক্ষিত পাত্র চাই । পাত্রীর উচ্চতা ৫ ফিট ২ ইঞ্চি বয়স ৩২ । গায়ের রং ফর্সা ।
এই মেয়ে তো দেখি সব গুন একাই নিয়ে রেখেছে । ঠিকানাটা নিলাম আমি । পাত্রী দেখতে যাবো । কেন জানি হাটতে মন চাচ্ছে না আমার । চা খেয়ে মনে হচ্ছে শরীর ভারি হয়ে গিয়েছে । একটা রিকশা নিয়ে আমি সোজা পাত্রীর বাড়ীর ঠিকানায় রওনা হলাম । গেটে তো কোন সাইন বোর্ড নেই । আমি দরজায় কড়া নাড়লাম ।
-কাকে চান ?
- জ্বি এটা কি রূপসী নামাজি , একমাত্র বাবার একমাত্র কন্যা , ডিভোর্সি , এক সন্তানের জননী , আমেরিকান সিটিজেনশীপ পাত্রীর বাসা ?
-এটা এডভোকেট এ কে আজাদ এর বাসা ।
-এখানেই কি পাত্র নিয়োগ করা হবে ?
-মানে ? কি বলছেন এসব ?
-জ্বী আমি পাত্রের ইন্টার্ভিউ দিতে এসেছি । আমার একজন বউ খুব দরকার ।
লোকটা হা করে তাকিয়ে আছে আমার দিকে । আমি কি ভুল বাড়িতে চলে এসেছি ? না ঠিকানা তো ঠিক আছে ।
আমাকে ভিতরে আসতে দিয়েছে । জামাই আদরই করছে বলা যায় । আলুর সিঙ্গারা খেতে দিয়েছে । আমার ইন্টার্ভিউ মনে হয় নেবে না । পাত্র নির্বাচন হয়ে গিয়েছে কিনা কে জানে । বয়স্ক একজন লোক এদিকে আসছে । এই টাইপের লোক দেখলে দাঁড়ানো উচিত । আমি উঠে দাড়াই নি । আলুই সিঙ্গারাই বসে বসে খাচ্ছি।
-তুমি কি এখানে পাত্রী দেখতে এসেছ ?
-জ্বি পাত্র চাই বিজ্ঞাপন দেখে এসেছি । 
-ওখানে আমার মেয়ের বয়স দেয়া আছে দেখেছ ?
-জ্বি ৩২ বছর । একটা সন্তান আছে সেটাও দেখেছি । কি নাম ওর ? কতো বড় ?
-মিতুল । ক্লাস টুতে পড়ে ।
-পাত্রীকে নিয়ে আসুন । আমার আবার তাড়া আছে । বৃষ্টি এলে কিন্তু আমি চলে যাবো ।
-কেন ?
-বৃষ্টি এলে তো আমি বৃষ্টিতে ভিজবো তখন আর পাত্রীকে দেখা হবে না ।
পাত্রীকে নিয়ে আসা হয়েছে । পাত্রী দেখতে ভালোই সুন্দর। মেক আপ টেকাপ বেশি করে নি তার পরেও সুন্দর লাগছে । ন্যাচারাল বিউটি বলা যাবে এই মেয়েকে । কথা একটু কম বলে মনে হয় । অসুবিধা নেই আমার মামাও তো বেশি কথা বলে না । আর তাছাড়া দুজনকে মানাবেও । মনে হচ্ছে মামার বিয়েটা এবার হবে । মিতুলও তার বাবা পাবে । নতুন একটা সংসারে ঘর বাধবে কষ্টে জর্জরিত তিনটি মানুষ । ভাবতেই ভালো লাগে ।
বাহিরে বৃষ্টি হতে শুরু করেছে । মাঝ আকাশের বিদ্যুৎ চমকানোর আলোটা আমার চোখে মুখে ছিটে আসছে জানালা দিয়ে । সেই সাথে আসছে বৃষ্টির কিছু আপসা ছায়া । জালনার পালন গুলো দুলছে জল তরঙ্গের ঢেউ এর মতো । সব মিলিয়ে সে এক অন্যরকম অনুভূতি । যা প্রতিদিন পাওয়া যায় না ।
আমি চলে এলাম । বাহিরে টুপটুপানি বৃষ্টি হচ্ছে । অজানা কোন এক পথ ধরে হাটতে লাগলাম । কিছুক্ষণ পরে হয়তো রাতের অন্ধকার নেমে আসবে । আকাশ তখন পড়বে কালো শাড়ি কপালে দেবে জোসনা রংয়ের টিপ । দিনের ক্লান্ত শেষে ব্যস্ত মানুষগুলো ঘুমিয়ে পরবে যে যার ঘরে । আমি থাকবো জেগে । হারিয়ে যাবো দুর কোন অজানায় আরোবির মাঝে । যেখানে থাকবে না জীবনের কোন কোলাহল । থাকবে না কোন বাস্তবতা । যেখানে থাকবে শুধু আমার কল্পনা !
.
মেহেদী হাসান মিহি
২০.০৫.২০১৫

No comments:

Post a Comment