Saturday, June 18, 2016

অদ্ভুত ভবঘুরে - ৫

ত ১২:৫৭...লেখার জন্য সময়টা একেবারে খারাপ না । চারিদিকে নিরিবিলি সেই সাথে ঝিঝি পোকার ডাক সব মিলিয়ে আলাদা এক ভালো লাগা । মনে হচ্ছে এক কাপ চা হলে ভালো হতো । আম্মুকে বললে করে দেবে কিন্তু এতো রাতে আম্মু কে আর ডাকতে মন চাচ্ছে না । কে জনে যে এই রাত দুপুরে এখন আবার আমার চা খেতে মন চাইবে ।
সময় কাটানোর জন্য একটা গল্পের বই পড়ছিলাম আমি । ইদানীং কেন জানি সময় কাটতে চায় না । ঘড়ির দিকে তাকালাম । রাত একটার মতো বাজে । বন্ধুদের অনেকের কাছ থেকেই শুনেছি বই পড়লে নাকি ঘুম আসে । আমার কেন জানি ওরকম হয় না । ঘুম না আসার একটা জ্বালা আছে । কিন্তু সেই সাথে আছে অন্য রকম এক ভালো লাগাও। বইটা পড়তে খারাপ লাগছে না । ফোন বেজে উঠলো আমার । এতো রাতে আবার আমাকে কে ফোন দেবে ? অনিচ্ছা শর্তেও আমি ফোন রিসিভ করলাম ।
-ইয়ো
-ইয়ো । এতো রাতে ফোন দিয়েছিস কেন ? কোন সমস্যা ?
-না রে । এমনিতেই ঘুম আসছিল না । তুই জেগে থাকিস তাই ফোন দিলাম ।
-ও ! ফ্রি মিনিট পাইছিস ?
-হুম । জানিস নতুন একটা গান কম্পোজ করেছি । সেই লাগে শুনতে । ভাবলাম তোকে শুনাই ।
-তুই গান কম্পোজ করা শুরু করলি কবে থেকে ?
-আমি তো সেই ক খ এর যুগ থেকেই কম্পোজ করি । তোর মাথা গেছে বুঝলি । ভালো একটা ডাক্তার দেখা । 
-ঠিক আছে দেখাবো ।
-দোস্ত একটা হট নিউজ আছে ।
-কি হট নিউজ ?
-আমি তো এখন ফটোগ্রাফার হইছি রে ।
-ও তাই । ভালোই তো । আমার একটা ছবি তুলে দিস ।
-আমি পাগলের ছবি তুলি না । হে হে 
-ও আচ্ছা । তাহলে ফোন রাখ এখন ।
-গানটা শুনাই ?
-না থাক পরে শুনবো । এখন আর গান শুনতে ইচ্ছে করছে না।
-এইটা তুই বলতে পারলি ? মনে রাখিস এই আমি একদিন নাম করা শিল্পী হবো । সেদিন তুই আমার অটোগ্রাফ নেয়ার জন্য পিছে পিছে ঘুরবি ।
-ঠিক আছে ঘুরবো । কারো পেছনে ঘুরতে খুব একটা অসুবিধা নেই আমার । এখন তুই ফোন রাখ ।
-আচ্ছা ।
চারিদিকে ফটোগ্রাফারের হাট বাজার লেগে গেছে । এই যুগে আর যাই হোক কেন ফটোগ্রাফারের অভাব নাই । চোখ খুললেই চোখে পরে এখন অমুক ফটোগ্রাফি তুমুক ফটোগ্রাফি । অথচ এতো ফটোগ্রাফার থাকতেও আমার কোন ভালো ফটো নাই । ফোনে কেন জানি খুব বেশি কথা বলতে পারি না আমি । কান গরম হয়ে ওঠে । মনে হচ্ছে গানটা শুনলেও হতো । সময়টা আর একটু কেটে যেত । ছেলেটা গান যে একেবারে খারাপ বলে তা নয় ।
নিজেকে নিয়ে মাঝে মাঝে ভাবি আমি । কে আমি ? কোথায় থেকে এসেছি ? কোথায় যাবো আবার ? এই সব ফালতু চিন্তা ভাবনা কিভাবে যে আমার মাথায় ঢুকে গেল কে জানে । ইদানীং কেন জানি একটা অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকি । হয়তো কেউ এসে আমাকে নিয়ে যাবে । গতরাতে একটা স্বপ্ন দেখেছিলাম । স্বপ্নটা এরকম যে আমি হাটতে ছিলাম ঠিক এমন সময় একটা সাপ এসে আমাকে কামড় দিচ্ছে । মজার ব্যাপার হচ্ছে আমার কোন যন্ত্রণা হচ্ছিলো না । কিন্তু সাপে কামড় দিয়েছে এটা ভেবেই আমি মারা যাচ্ছিলাম । মানুষের কল্পনা শক্তি প্রখর । শুধু মাত্র কল্পনাতেই কেউ একজন হাজার বার মরতে পারে ।
মনে হচ্ছে বাহিরে কেউ একজন কাঁদছে । সেই সাথে চাপা আর্তনাত । অস্পষ্ট এক শব্দতরঙ্গ আমার কানে অদ্ভুত এক কম্পনের সৃষ্টি করে যাচ্ছে । এতো রাতে কিসের কান্না ? আর তাছাড়া আমার মতো এই বাড়িটাও তো একা । আশে পাশে আর কোন বাড়ি নেই । আমি বাহিরে বের হলাম । প্রায় অন্ধকার রাত । আকাশের চাঁদটাও দেখা যাচ্ছে না । প্রকৃতির সিন্ধ বাতাস আমার শরীরের লোমগুলোকে দোলা দিয়ে যাচ্ছে । কেউ তো নেই । তাহলে ওই যে কান্নার শব্দটা ? ওই যে চিৎকার ? সব কি ভুল ছিল ?
মেয়েটার কান্না কিছুতেই থামানো যাচ্ছে না । সেই তখন থেকে কেঁদে যাচ্ছে । একবারের জন্যও থামে নি । আর কাঁদবেই না বা কেন । ওর ছোট্ট শরীরটাকেও তো কেউ ছাড়ে নি । কি আছে ওই শরীরে ? যেটার কাছে একটা নিষ্পাপ জীবনও তুচ্ছ । সামান্য শান্তির জন্য একটা জীবন যারা নষ্ট করে তারা আর যাই হোক মানুষ না । মানুষের বিবেক আজ কোথায় লুকিয়ে আছে ? শারীরিক চাহিদা খুব বেশি হয়ে থাকলে বিয়ে করে ফেলুন । কিন্তু কারো জীবন নষ্ট করার কোন মানে হয় না । র‍্যাপিস্ট এর সাথে আমাদের পার্থক্য কি জানেন ? আমরা দুজনেই প্রায় সমান অপরাধী । পার্থক্য শুধু এতোটুকু যে ওরা রেপ করতে জানে আর আমরা রেপ কিভাবে করে সেটা দেখতে জানি । কিন্তু কেউ প্রতিবাদ করতে জানি না । এর চেয়ে লজ্জা জনক আর কিছু হতে পারে না আমাদের জন্য । যেখানে আমরা আমাদের মা বোনের সম্মান রক্ষা করতে জানি না । সেখানে আমরা কিভাবে নির্দোষ ?
আমাকে ধরে নিয়ে এসেছে ওরা । মেয়েটাকেও বাচতে দেয় নি । আমাকেও মেরে ফেলবে কিছুক্ষণ পরে । আমি যে ওদের সাক্ষী । খুব পরিকল্পিত একটা মৃত্যু হবে আমার । সবকিছুই ওরা ঠিক করে রেখেছে । মেয়েটাকে আমি খুব কাছে থেকে দেখেছিলাম । শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে বাচতে চেয়েছিল ও । কিন্তু পারে নি । মারা যাওয়ার আগে খুব শটফট করেছিল । হয়তোবা খুব কষ্ট হচ্ছিল ওর । আচ্ছা আমিও তো মারা যাবো । তখন কি আমার কষ্ট হবে ?
.
মেহেদী হাসান মিহি
২৮.০৫.২০১৫

No comments:

Post a Comment