Saturday, June 18, 2016

অদ্ভুত ভবঘুরে - ৫

আজ রাতটা অন্ধকার । আকাশে চাঁদটাও মেঘের আড়ালে লুকিয়ে আছে । তারাগুলোও আজ হারিয়ে গেছে দূরে কোথাও । অন্ধকার রাতে আমি হাটতে ছিলাম । আমি সেই কবে থেকে নিশাচর সেটা আমি নিজেও জানি না । শুধু জানি রাত জাগতে ভালো লাগে । ভালো লাগে রাতের নিশ্চুপ প্রকৃতি উপভোগ করতে । হারিয়ে যেতে মন চায় দুরে কোন অজানায় । আমি ঘড়ির দিকে একবার তাকালাম । খুব বেশি রাত না । নয়টার মতো বাজে । পৃথিবীর মানুষ আর এখন আগের মতো বাহিরে বের হয় না । সবাই সংসার নিয়ে ব্যস্ত । সবাই নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত । সামনে একটা লোককে দেখতে পাচ্ছি । খুব মনোযোগ দিয়ে কি জানি খুঁজছে ডাস্টবিনে । আমিও দাঁড়ালাম । দেখি তো কি খোজে । ডাস্টবিনে কি আজকাল মানুষ মূল্যবান কিছু ফেলে যাচ্ছে ? না ছেলেটা যা খুঁজে পেল তা হলো কিছু ফেলে দেয়া খাবার । খাবারগুলো সে খুব তৃপ্তির সাথে খাচ্ছে । অবাক হওয়ার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছি আমি অনেক আগেই । সত্যি পৃথিবী আজ অনেক উন্নত হয়েছে । মানুষের আর খাবারের অভাব হয় না । ডাস্টবিনেও এখন আমাদের খাবার পাওয়া যায় !
.
হাটতে হাটতে কোথায় যে হারিয়ে গিয়েছিলাম কে জানে । আমার ফোন আমার সেই কল্পনার মুহূর্ত থেক জেগে তুললো । রিংটোনটা ভালো লাগে শুনতে । আমি ফোন রিসিভ করলাম । শুনতে পেলাম আমার খুব পরিচিত একটা কণ্ঠ ।
-হ্যালো
-কেমন আছো ?
-ভালো আছি । ফোন ধরছিলে না কেন ?
-ঘুমাই পরে ছিলাম মনে হয় ।
-সারারাত কি করো ?
-তোমার সাথে গল্প করি ,জেগে থাকি আর ঘুমাই ।
-তোমার না আজ আমার সাথে দেখা করার কথা ছিল ।
-হ্যাঁ আসতেছি তো ।
-মানে কি ?
-মানে হেটে হেটে আসতেছি তোমার কাছে ।
-এতো রাতে আসতে হবে না । ওষুধ খেয়েছ ?
-না তোমার ওখানে যেয়ে খাবো ।
-তুমি কি সত্যি আসবে ?
-হুম
.
আমি ফোন রেখে দিলাম । রিকশায় চড়ে যাবো আজ । সুন্দর দেখে একটা রিকশা ঠিক করতে হবে । কতো রিকশা ! আমি রিকশায় খুব একটা উঠি না । মাথা ঘোরে । আজ কেন জানি উঠতে মন চাচ্ছে । চোখ বন্ধকরে থাকা যেতে পারে । দুই মিনিট পর চোখ খুলে যে রিকশা সব চেয়ে আগে আমার চোখে পরবে সেই রিকশাতে যাবো ।
শুনতে পেলাম কেউ যেন আমাকে ডাকছে । এতো রাতে এখানে আবার আমাকে কে ডাকে ? তাও আবার একটা মেয়ে কণ্ঠ । আমি কি একবার অবাক হবো ? মাঝে মাঝে অবাক হতে ভালো লাগে । কিন্তু এই সামান্য ব্যাপারে অবাক হওয়া যায় না । আর তাছাড়া এখনো তো দুই মিনিট হয় নি । তাই চোখ খোলা যাবে না । যে হয় হোক !
-এই যে ভাইয়া ?
-জ্বি আপু বলেন ।
-আমাকে একটু হেল্প করবেন ?
-জ্বি না । আমার তাড়া আছে ।
-আপনি তো এখানে দাড়িয়েই আছেন । চোখ বন্ধ করে আছেন কেন ?
-আমি মনে মনে একটা শপথ বাক্য পাঠ করেছি তো সেজন্য ।
-কতক্ষণ চোখ বন্ধ করে থাকবেন ?
-দুই মিনিট
-আমার মনে হয় আপনার চোখ বন্ধ করে থাকার পাঁচ মিনিটের বেশিই হয়ে গেছে ।
-আপনি কিভাবে বুজলেন ?
-আমি বেশ কিছুক্ষণ থেকে আপনাকে নোটিশ করছি ।
আমি চোখ খুললাম । আমাকে আবার দেখবে কেন ? আমি আবার কি করেছি ? আমার ভাগ্য মনে হয় খুব একটা ভালো না , চোখের সামনে একটা রিকশাও দেখতে পেলাম না । তারচেয়ে শুনি আপুটা কি বলে ।
.
-আমাকে লক্ষ্য করছিলেন কেন ?
-আশে পাশে অন্য কাউকে খুঁজে পাচ্ছিলাম না সে জন্য । আপনি কি আমাকে একটু বলবেন এই ঠিকানাটা কোথায় ।
-এটা তো হাসপাতালের ঠিকানা । ওখানে অসুস্থ মানুষরা থাকে ।
-উফ ! আমি জানি হাসপাতালে অসুস্থ মানুষেরা থাকে । আপনি কি একটু বলবেন হাসপাতালটা কোন দিকে ?
-বেশি দুরে না হেটেই যেতে পারবেন । সোজা যেয়ে ডান দিকে দেখবেন বড় করে সাইন বোর্ড দেয়া আছে

-দেখুন আমার বাবা খুব অসুস্থ । আমি এখানকার কিছুই চিনি না ভালো করে । এদিকে রাত হয়ে গিয়েছে । যদি পারেন আমাকে একটু হাসপাতাল পর্যন্ত এগিয়ে দিন না ।
-ঠিক আছে ।
-আমার এই ব্যাগটা একটু ধরবেন ।
-ঠিক আছে ধরবো ।
ভারী একটা জিনিস নিয়ে আমি হাঁটছি । নিজেকে খুব শক্তিশালী মনে হচ্ছে কেন জানি । কিন্তু আমি মোটেই শক্তিশালী না । ছোট এই জীবনের রাস্তায় চলতে যেয়েও হোঁচট খেয়েছি অনেক বার ! ব্যাগটা এতো ভারি কেন ? এতো ভারি জিনিস নিয়ে কেউ হাসপাতালে আসে ? মেয়েটা মাঝে মাঝে আমার দিকে আড় চোখে তাকাচ্ছে । হয়তোবা ভাবছে অন্য কারো সাহায্য নিলে মনে হয় ভালো হতো ।
এই জায়গাটা আমার পরিচিত । এই হাসপাতালে তো আমিও একদিন এসে ছিলাম । আমিও কেঁদেছিলাম খুব । হাসপাতালের সবাই আমাকে দেখে ছিল সেদিন । আর আমি দেখেছি আমার বাবার মৃত্যুটা সেই সাথে আমার মা বোনের কান্না । আজ আর আমার চোখে নেই কোন জল । আছে শুধু এক নির্বাক সচ্ছলতা । যে সচ্ছলতার মাঝে আমি হারিয়ে যেতে পারি দুরে কোথাও । নিজেকে লুকিয়ে রাখতে পারি সবার কাছে থেকে ।
.
মেয়েটাকে হাসপাতালে রেখে এসে আমি হাটতেছি আমার মতোই । ফুটপাতে দেখতে পেয়েছি হাজারো মানুষ । কে বলে এই দেশে থাকার জায়গার অভাব আছে ? আমি তো দেখতে পাচ্ছি আমাদের আজ থাকার জায়গার অভাব নেই । মানুষ নাকি সৃষ্টির সেরা জীব । অথচ আজ সেই মানুষ খাচ্ছে রাস্তার খাবার । থাকার জন্য বেচে নিয়েছে কুকুরের পাশে পরে থাকা জায়গাটুকু । একবারও ভাবি না ওরাও তো মানুষ । এই হচ্ছে আমাদের মানবতা । যে মানবতার জন্য আজ আমরা মানুষ । সে মানবতা আজ প্রায় বিলুপ্তের পথে !
রাতের নীরবতা গভীর হচ্ছে । আমার হাটতে ক্লান্ত লাগছে । ঘুমোতে ইচ্ছে করছে ফুটপাতে শুয়ে থাকা মানুষগুলোর সাথে । হয়তোবা আজকের লেখাটা ওদের জন্যই । ওঁদের সাথে গল্প করতে ইচ্ছে করছে কেন জানি । জানতে ইচ্ছে করছে তাঁদের সুখ দুঃখের গল্পগুলো । কিন্তু আমি সেটা পারি না । আমার যে আবার তাড়া আছে । ওর সাথে তো দেখা করতে হবে !
.
মেহেদী হাসান মিহি
১৫/০৭/২০১৫

No comments:

Post a Comment